বাংলাদেশের কৃষক রচনা ২৫ পয়েন্ট সহজ ভাষায়

বাংলাদেশের কৃষক রচনা ২৫ পয়েন্ট সহজ ভাষায়

বাংলাদেশের কৃষক ও কৃষি ব্যবস্থা অর্থনীতিতে অবদান, বর্তমান অবস্থা ও উত্তরণের উপায়

ভূমিকা

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা আমাদের এই অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশ। আবহমান কাল ধরে এই দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা মাটি ও প্রকৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। আর এই দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হলো বাংলাদেশের কৃষক। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং এদেশের অধিকাংশ মানুষই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এদেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ কৃষি পেশার সাথে সরাসরি জড়িত। যারা সরাসরি কৃষিকাজ করেন না, তারাও জীবনের নানা ধাপে কৃষি পণ্যের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকেন। এজন্য এদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মূলত কৃষিকেন্দ্রিক। কৃষি ব্যবস্থার উন্নতি ও অবনতির উপরই সারা দেশের মানুষের ভাগ্য নির্ভর করে। অথচ, যে কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের জন্য অন্ন উৎপাদন করেন, সেই কৃষক সমাজই আজ সমাজে সবচেয়ে বেশি অনাদৃত, লাঞ্ছিত এবং উপেক্ষিত। যুগে যুগে তারা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। তাদের এই চিরচেনা রূপটি কবি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন-

“ভোর না হতেই লাঙল কাঁধে মাঠপানে কে যায়, সে আমাদের গাঁয়ের কৃষক, বাস আমাদের গাঁয়।”

কৃষি ও কৃষক

বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু এবং মানুষের জীবনের সাথে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে জুড়ে আছে এদেশের কৃষি ও কৃষক। এই দেশের যেসকল সোনার মানুষেরা রোদ, বৃষ্টি ও ঝড় উপেক্ষা করে দিনের পর দিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমাদের সারা দেশের মানুষের খাদ্যশস্যের জোগান দিয়ে থাকেন, তারাই হলেন বাংলাদেশের কৃষক। বাংলাদেশের সামাজিক ও আর্থিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে কৃষিভিত্তিক। আর কৃষি কাজ করে, জমিতে ফসল ফলিয়ে যারা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন, তারাই মূলত কৃষক হিসেবে পরিচিত। কৃষককুলের হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম, অপরিসীম ত্যাগ এবং ঘামের বিনিময়েই তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এদেশের বর্তমান অর্থনীতি। চরম দুঃখ, দারিদ্র্য, অভাব এবং সমাজের নানা লাঞ্ছনা ও গঞ্জনা সহ্য করে তারা যেভাবে নিরবে দেশের ও দশের সেবা করে যাচ্ছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তার তুলনা মেলা ভার। কৃষকের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই এদেশের প্রান্তর ভরে ওঠে সবুজ ফসলের সমারোহে এবং আমরা প্রতিদিন পাই আমাদের ক্ষুধার অন্ন। তাছাড়া, কৃষকের উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিজাত কাঁচামাল বিদেশে রপ্তানি করে দেশের অর্থনীতি প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ হচ্ছে, অর্জিত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এবং এরই হাত ধরে দেশে সম্ভব হচ্ছে নতুন নতুন শিল্পায়ন। তাই এটি নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, এদেশের অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য ও অপরিহার্য অংশ হলো আমাদের কৃষি ও কৃষক।

বাংলাদেশের কৃষক

‘ভোর না হতেই লাঙ্গল কাঁধে, মাঠ পানে কে যায়। সে আমাদের গাঁয়ের কৃষক, বাস আমাদের গাঁয়।’

বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি জনপদে এমনই সরল ও পরিশ্রমী কৃষকের বাস। ভোরের আলো ভালো করে ফুটতে না ফুটতেই, পাখিদের কলকাকলির সাথে সাথে প্রতিটি কৃষক তার লাঙ্গল ও অন্যান্য কৃষি সরঞ্জাম কাঁধে নিয়ে মাঠের পানে ছুটতে থাকেন। মাথার উপর প্রখর রোদ, মুষলধারে বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত—কোনো কিছুই তাদের দমিয়ে রাখতে পারে না। প্রকৃতির সব রুক্ষতা উপেক্ষা করে, অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা জমিতে ফসল ফলান। একেবারে ভোরবেলা থেকে শুরু করে সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসা পর্যন্ত একটানা চলতে থাকে তাদের এই হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম। এভাবেই প্রতিদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, শরীরের সমস্ত শক্তি ব্যয় করে প্রতিটি কৃষক কেবল আমাদেরই বাঁচিয়ে রাখার জন্য উৎপাদন করে যাচ্ছেন ধান, গম, পাটসহ নানা ধরনের খাদ্য শস্য ও অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্য। বাংলাদেশের কৃষক যেন এক জীবন্ত আত্মত্যাগের প্রতীক, যারা নিজেদের সর্বস্ব দিয়ে সমাজকে টিকিয়ে রেখেছেন।

কৃষিনির্ভরতা

বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে এবং সমাজ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের কৃষক এক সুদূরপ্রসারী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের উপর ভিত্তি করেই মূলত এদেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। একটি দেশের জাতীয় আয় সৃষ্টিতে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে কৃষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য খাদ্যদ্রব্য এবং নিত্য প্রয়োজনীয় কৃষিজাত দ্রব্যাদির সিংহভাগ জোগান দেন আমাদের এই কৃষকেরাই। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য কেবল দেশের মানুষের বিশাল চাহিদাই মেটায় না, বরং উদ্বৃত্ত পণ্য দেশের বাইরেও রপ্তানি করা হয়। এর ফলে দেশ অর্জন করে মহামূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা, যা economy of Bangladesh কে শক্তিশালী করে তোলে। এদেশের অধিকাংশ মানুষের খাদ্যের প্রধান জোগানদাতা হলেন কৃষক। বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত, ডাল, আলু, বিভিন্ন ধরনের তরকারি, তৈলবীজ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সব প্রয়োজনীয় উপাদান কৃষকই উৎপাদন করে থাকেন। এই কৃষিজাত পণ্যগুলো খেয়েই আমরা জীবনধারণ করি এবং সুস্থ সবলভাবে বেঁচে থাকি। তাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কৃষিনির্ভরতা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

কৃষকের জীবন

বাংলাদেশের কৃষকের জীবন চরম দুঃখ, কষ্ট আর অভাব-অনটনে ভরপুর। দারিদ্র্য যেন তাদের নিত্যদিনের অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। একজন কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অত্যন্ত কঠিন ও অমানুষিক পরিশ্রম করে মাঠে সোনার ফসল ফলান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সেই মাথার ঘাম পায়ে ফেলা শস্যের ন্যায্য মূল্য তিনি কখনোই পান না। ফসল উৎপাদনের জন্য যে উপযুক্ত অর্থের প্রয়োজন, তা তিনি পান না। চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী বলদ বা আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত মানের ভালো বীজ কিংবা সঠিক সময়ে সার—এসবের অনেক কিছুই তার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এতো পরিশ্রমের পর দিন শেষে তিনি যা পান তা হলো সীমাহীন ক্ষুধা, নানা ধরনের রোগ-ব্যাধি এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছ থেকে বঞ্চনা ও শোষণ। বাংলার কৃষকেরা যুগ যুগ ধরে নানাভাবে শোষণের শিকার হয়ে আসছেন। তাদের জীবনের চাওয়া অত্যন্ত সীমিত; তারা কেবল দুবেলা দুমুঠো খেয়ে-পরে পরিবার নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চান। কিন্তু আধুনিক এই সমাজ ব্যবস্থায় সেই স্বাভাবিক বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার থেকেও তারা আজ অনেকাংশে বঞ্চিত।

কৃষকের অতীত ব্যবস্থা

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, অতীতে গ্রামবাংলার কৃষকদের জীবন অনেক বেশি সুখী, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও শান্তিময় ছিল। সে যুগে ‘গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, পুকুরভরা মাছ’ কেবল প্রবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলার সাধারণ কৃষকের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব দৃশ্য। পরিবারের সবাই মিলে মাঠে কাজ করত এবং সারা বছর খেয়ে-পরেও কৃষকের ঘরে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য উদ্বৃত্ত থাকত। সেই সময়ে কৃষকদের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর। তারা তাদের প্রয়োজনীয় অন্ন ও বস্ত্রের সংস্থান নিজেদের পরিশ্রমের মাধ্যমেই অনায়াসে করতে পারতেন। অভাব তাদের তেমন একটা স্পর্শ করতে পারত না বলে সমাজের বিভিন্ন পূজা-পার্বণে, ঈদ উৎসবে এবং গ্রামীণ মেলাগুলোতে তাদের আনন্দের কোনো সীমা থাকত না। অতীতকালের সেই কৃষকদের মনে এক ধরনের তৃপ্তি ও শান্তি বিরাজমান ছিল যা বর্তমান সময়ে অনেকটাই বিরল।

কৃষকদের বর্তমান অবস্থা

অতীতের সেই সোনালী দিনের বিপরীতে, বর্তমানে বাংলাদেশের কৃষকদের জীবন চরম দুঃখ, কষ্ট আর অভাব অনটনে পরিপূর্ণ। নানা ধরনের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের ফলে এদেশের কৃষক এখন জীর্ণ-শীর্ণকায় গরু আর মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি দিয়ে অতি কষ্টে ফসল ফলাচ্ছেন। ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং ক্রমাগত ঋণের বোঝার কারণে তারা আজ গভীর হতাশায় এক গ্লানিময় জীবনযাপন করছেন। চরম দারিদ্র্য আর নানা ধরনের রোগ-শোক তাদের নিত্য সাথী হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেরই আজ দুবেলা পেট ভরে খাওয়ার মতো অন্ন নেই। অসুস্থ হলে সুচিকিৎসা বা রোগের ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই, এমনকি অনেক ভূমিহীন কৃষকের মাথা গোঁজার মতো নিজস্ব একটু ঠাইটুকুও অবশিষ্ট নেই। দিনের পর দিন একবেলা খেয়ে না খেয়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, প্রখর রৌদ্রে পুড়ে তারা আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তুলছেন। অথচ সমাজের কারো বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রকাশ্য অভিযোগ নেই। তারা নিজেদের সকল বঞ্চনা আর ভাগ্যের উপর সবকিছু ছেড়ে দিয়েছেন। নিরক্ষরতার অভিশাপ মাথায় নিয়ে, অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত থেকে, প্রাচীন সেই কাঠের লাঙল সম্বল করেই জীবনসংগ্রামে আজ তারা ক্ষতবিক্ষত এবং বিপর্যস্ত।

জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি ও কৃষক

আমাদের দেশের অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ডই হলো কৃষি। আর এই agriculture in Bangladesh এর প্রাণ হলেন বাংলাদেশের কৃষক। তাই বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা অপরিসীম এবং অনস্বীকার্য। কোনো বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো কারণে কৃষির উৎপাদন কম হলে দেশে ভয়াবহ খাদ্যের ঘাটতি দেখা দেয়। যার ফলে বাধ্য হয়ে বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে প্রচুর পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হয়, ফলশ্রুতিতে দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের দাম হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরমভাবে ব্যাহত হয়। শুধু তাই নয়, দেশের যেসকল ছোট-বড় শিল্পকারখানা সরাসরি কৃষির কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল, কৃষির উৎপাদন কমলে তাদের কারখানার উৎপাদনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এর একটি নেতিবাচক ও বিরাট প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে, সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত হলে এবং কৃষকের পরিশ্রমে কৃষি পণ্যের উৎপাদন বাড়লে, দেশের অভ্যন্তরীণ বিশাল চাহিদা মিটিয়েও দেশ অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তাই এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, দেশের সমৃদ্ধি ও অর্থনীতি অনেকাংশেই কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ও কৃষকের অবস্থার উপর নির্ভরশীল।

বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা

বর্তমান যুগে বিশ্বায়নের এই সময়ে আমাদের দেশের অর্থনীতি দৃঢ়ভাবে কৃষির উপর দণ্ডায়মান। তাই দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করতে কৃষি ও কৃষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছেন। কৃষকের উৎপাদিত বিভিন্ন কৃষিজাত কাঁচামাল এবং ফসল দেশের মানুষের বিশাল চাহিদা মিটিয়ে আজ নিয়মিতভাবে বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। তাছাড়া, দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা বড় বড় শিল্পকারখানাগুলো কৃষকদের উৎপাদিত এসব কাঁচামালগুলোকে নিপুণভাবে কাজে লাগিয়ে নানা ধরনের উন্নত মানের প্রক্রিয়াজাত পণ্য উৎপাদন করছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলছে। পাটজাত দ্রব্য, চা, চামড়া, হিমায়িত খাদ্য এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য রপ্তানি করে আমাদের দেশ প্রতি বছর লাভ করছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এই অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অন্যান্য খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তাই দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে কৃষি ও কৃষকের নিরলস ভূমিকা কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই।

খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে কৃষি ও কৃষক

ঐতিহাসিকভাবেই আমরা জাতি হিসেবে ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ হিসেবে পরিচিত। মাছ এবং ভাত আমাদের প্রধান ও সবচেয়ে প্রিয় খাবার। তাছাড়া আমাদের প্রতিদিনের প্রাত্যহিক খাবারের তালিকায় নিয়মিতভাবে থাকে ভাত, মাছ, নানা ধরনের শাকসবজি, ডাল, তেল, ফলমূল ইত্যাদি। এই সমস্ত অপরিহার্য খাদ্য উপাদানের সিংহভাগ জোগান দেন মূলত আমাদের দেশের অক্লান্ত পরিশ্রমী কৃষকেরাই। আমাদের দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৯০ ভাগ ফসলের জমিতেই নানা জাতের খাদ্যশস্য চাষ করা হয়। এর মধ্যে আবার প্রায় ৭০ শতাংশ জমিতেই প্রধান খাদ্য হিসেবে ধান চাষ করা হয়। তবে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়। তাছাড়া দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার তুলনায় চাষযোগ্য জমির পরিমাণ অনেক কম হওয়ায়, চাষিরা অনেক সময় দেশের সম্পূর্ণ খাদ্য চাহিদা একাই পূরণ করতে পারেন না। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিশাল খাদ্য চাহিদা দেশের এই অদম্য চাষিরাই পূরণ করে থাকেন, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় অবদান।

পুষ্টি সমস্যা সমাধানে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো পুষ্টিহীনতা। আমাদের দেশের, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এবং বস্তি এলাকায় প্রতিবছর অসংখ্য শিশু সঠিক পুষ্টিহীনতার কারণে নানা জটিল রোগে ভুগে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন তথ্যমতে, দেশে প্রতি ১০০ জন মহিলার মধ্যে প্রায় ৭০ জনই কোনো না কোনো মাত্রার রক্তশূন্যতা বা অ্যানিমিয়ায় ভুগছেন। তাছাড়া পর্যাপ্ত ভিটামিন যুক্ত খাবারের অভাবে প্রতিবছর শুধুমাত্র ভিটামিন এ এর অভাবেই মারা যাচ্ছে প্রায় ৩০ হাজারের মতো নিষ্পাপ শিশু, অন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেকে। দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জেলাগুলোতে আয়োডিনের অভাবে গলগণ্ড রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ১৬ জেলার প্রায় ১২ লাখের বেশি সাধারণ মানুষ। এই ভয়াবহ জাতীয় পুষ্টি সমস্যা সমাধানে আমাদের দেশের কৃষকেরা এক নীরব সৈনিকের মতো কাজ করে যাচ্ছেন। তারা জমিতে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর শাকসবজি, ডালজাতীয় শস্য এবং প্রচুর ভিটামিনসমৃদ্ধ ফলমূল উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের আপামর জনসাধারণের এসব মারাত্মক পুষ্টির সমস্যা সমাধানে এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন।

শিল্পায়নে কৃষি ও কৃষকের অবদান

যেকোনো দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য শিল্পের উন্নয়ন অপরিহার্য। আর আমাদের দেশের শিল্পের এই দ্রুত উন্নয়নে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা আক্ষরিক অর্থেই অবর্ণনীয়। দেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হলো তৈরি পোশাক শিল্প। আর এই পোশাক শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুতাসহ অনেক কাঁচামালও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আসে কৃষি খাত থেকেই। তাছাড়া, বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে কৃষকদের হাতে উৎপাদিত উন্নত মানের চা আজ সারা বিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশের বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতি বছর উৎপাদিত হচ্ছে উন্নতমানের গম, যা থেকে বিভিন্ন কারখানায় তৈরি করা হচ্ছে উৎকৃষ্ট মানের আটা, ময়দা, সুজি এবং নানা ধরনের বেকারি পণ্য। চিনি শিল্প, পাট শিল্প, ভোজ্যতেল শিল্পসহ অসংখ্য শিল্পকারখানা সরাসরি কৃষকের উৎপাদিত ফসলের উপর নির্ভরশীল। কৃষকের উৎপাদিত এসব ছোট-বড় বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামাল উৎপাদনের মাধ্যমেই একটু একটু করে দেশের শিল্পায়নের চাকা সচল রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত এর অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে।

রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে কৃষি ও কৃষকের অবদান

বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ের একটি অত্যন্ত বড় অংশ আসে সরাসরি কৃষিপণ্য এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প থেকে। একসময় বাংলাদেশের সোনালী আঁশ হিসেবে পরিচিত ছিল পাট। কারণ কৃষকের উৎপাদিত এই উন্নত মানের পাট থেকে দেশের কলকারখানায় তৈরি হয় টেকসই সুতা, মজবুত দড়ি, চট, বস্তা, নান্দনিক থলে, কার্পেট ইত্যাদি, যা বিদেশে চড়া দামে বিক্রি করার মাধ্যমে প্রতি বছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যাচ্ছে। পাটের পরই বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের তালিকায় চা উৎপাদনের কথা আসে, যা এর চমৎকার স্বাদ ও সুগন্ধের জন্য সারা বিশ্বে বহুল সমাদৃত। আমাদের দেশের অত্যন্ত সম্ভাবনাময় পোশাকশিল্পের মূল ভিত্তি বা কাঁচামালও নানা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসে কৃষি খাত থেকেই। এছাড়াও বর্তমানে প্রচুর পরিমাণে তাজা শাকসবজি, ফলমূল এবং হিমায়িত মাছ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। কৃষকের উৎপাদিত এসকল পণ্য নিয়মিতভাবে বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে দেশের সার্বিক রপ্তানি আয় দিন দিন ত্বরান্বিত হচ্ছে, যা আমাদের economy of Bangladesh কে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কৃষি ও কৃষকের ভূমিকা

বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা আমাদের দেশের অর্থনীতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির তুলনায় বেকার জনসংখ্যার হার অনেক বেশি। তবে, যেহেতু সনাতন বা আধুনিক যেকোনো পদ্ধতির কৃষিকাজেই প্রচুর জনশক্তির প্রয়োজন হয়, তাই এটি অনেক ক্ষেত্রেই বিপুল সংখ্যক বেকার জনগণের জীবিকার একটি প্রধান উপায় হতে পারে। বীজ বপন থেকে শুরু করে ফসল কাটা, মাড়াই করা এবং বাজারে পৌঁছে দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। তাছাড়া, কৃষির বিভিন্ন কাঁচামালের উপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠছে, যা ক্রমাগত গ্রামীণ ও শহুরে অনেক লোকের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করছে। ফলে দেশের ভয়াবহ বেকার সমস্যা দূর হচ্ছে এবং মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষি ও কৃষকের সমস্যা

এতক্ষণ আমরা কৃষির অবদান সম্পর্কে জানলাম, কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো আমাদের দেশের কৃষিখাত নানা ধরনের জটিল সমস্যার সাথে জর্জরিত। তাই নিজেদের জীবন বাঁচাতে এবং দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে চাষাবাদ চালিয়ে যেতে গিয়ে আমাদের দেশের সাধারণ কৃষকদের প্রতিনিয়তই নানান প্রতিকূল পরিস্থিতি ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি সমস্যা নিচে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলোঃ

  • মূলধনের অভাব: পূর্বের সোনালী দিনের মতো বর্তমানের কৃষকদের সেই গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ কিংবা গোয়ালভরা গরু কিছুই নেই। তারা অধিকাংশই বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কৃষিকাজ শুরু করার জন্য যে প্রাথমিক অর্থের প্রয়োজন হয়, তা তাদের থাকে না। তাই অনেকসময়ই মূলধনের অভাবে তারা সঠিক সময়ে ভালো বীজ, সার বা কীটনাশক কিনতে না পেরে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে তারা আরও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
  • প্রশিক্ষণের অভাব: আমাদের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে কৃষিতে আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার দক্ষ ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কৃষক। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের দেশের অধিকাংশ কৃষকই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাবঞ্চিত, অদক্ষ ও অশিক্ষিত। তারা তাদের বাবা-দাদার আমলে যে সনাতন নিয়ম দেখে এসেছেন, যুগের পর যুগ সেই একই নিয়মেই এখনো তারা তাদের ফসল তৈরির প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছেন। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। এমনকি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে গ্রামে গ্রামে কৃষকদের উপযুক্ত ও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়ার তেমন কোনো কার্যকরী ব্যবস্থাও চোখে পড়ে না। তাই আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাবে দেশের কৃষিখাত ক্রমাগত ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
  • কৃষি উপকরণের অভাব: বাংলাদেশের কৃষকেরা অধিকাংশই আর্থিকভাবে অনেক গরিব। যুগের সেই ভোঁতা হয়ে যাওয়া লাঙল আর জীর্ণ-শীর্ণ রোগা বলদই তাদের চাষাবাদের একমাত্র সম্বল। উন্নত বিশ্বের কৃষকদের মতো তাদের হাতে নেই আধুনিক ফসল ফলানোর যন্ত্র, ট্রাক্টর, হারভেস্টার, উন্নত জাতের উচ্চফলনশীল বীজ কিংবা আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি। এসব কৃষি উপকরণের দাম অনেক বেশি হওয়ায় তা তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে। ফলে আধুনিক চাষাবাদের দিক দিয়ে আমাদের দেশ ক্রমশই পিছিয়ে পড়ছে।
  • সেচ ব্যবস্থার অপ্রতুলতা: বাংলাদেশের কৃষিখাত এখনো অনেকাংশে প্রকৃতির খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে সেচ ব্যবস্থার জন্য অধিকাংশ কৃষকেরাই প্রকৃতির বৃষ্টির উপর ভরসা করেন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুকনো মৌসুমে সময়মতো বৃষ্টি না হলে তারা পানির অভাবে জমিতে সেচ দিতে পারেন না। খাল-বিল শুকিয়ে যায়, আবার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যায়। ডিজেল বা বিদ্যুতের দাম বেশি হওয়ায় পাম্প চালিয়ে সেচ দেওয়াও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তারা কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে না পেরে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হন।
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগ: ভৌগোলিক কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রধান সমস্যা। প্রতিবছরই বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা কিংবা অকাল বৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। কৃষিবিজ্ঞানীরা ইদানীং কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ সহনীয় বা লবণাক্ততা সহনীয় ফসলের জাত উদ্ভাবন করলেও, সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থার অভাবে প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকেরা সেই উন্নত ধানের বীজ পাওয়া থেকে এখনো অনেকটাই বঞ্চিত।
  • ত্রুটিপূর্ণ বাজার: আজকের দিনে আমাদের দেশের কৃষিবাজার ব্যবস্থায় ত্রুটি ও দুর্নীতির কোনো শেষ নেই। মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্রের কারণে কৃষকেরা হাড়ভাঙ্গা খাটুনি দিয়ে উৎপাদিত তাদের ফসলের ন্যায্য দাম কখনোই পান না। অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে অত্যন্ত অসাধু উপায়ে অনেক কম দামে কৃষকের কাছ থেকে ফসল কিনে নেয় এবং পরবর্তীতে শহরের বাজারে তা চড়া দামে বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভারী করে। এই ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থার ফলে অসাধু ব্যবসায়ীরা রাতারাতি বড়লোক হচ্ছে আর প্রকৃত কৃষকদের পথে বসতে হচ্ছে।
  • সংরক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটি: আমাদের দেশে প্রতিবছরই আলু, টমেটো, পেঁয়াজসহ কিছু পচনশীল ফসল চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি উৎপাদিত হয়। কিন্তু দেশজুড়ে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার এবং সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষক সেই ফসল বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন না। নষ্ট হওয়ার ভয়ে তারা তা অনেক কম দামে তাড়াতাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। এছাড়াও অনেক সময় দাম কমানোর পরেও ক্রেতা না পেয়ে খেতেই ফসল পড়ে থাকতে থাকতে পচে নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষক তার ফসলের কাঙ্ক্ষিত ন্যায্য মূল্য থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন।

কৃষকদের দুরবস্থার কারণ

উপর্যুক্ত সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আমাদের দেশে বিপুল লোকসংখ্যার তুলনায় মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ অনেক কম। জমির এই স্বল্প আয় দিয়ে কৃষকদের বড় সংসার কোনোভাবেই চলে না। চরম দারিদ্র্যের কারণে তারা আধুনিক শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হন। তাই বিজ্ঞানের নতুন নতুন আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও চাষাবাদ পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের ধারণাও থাকে অত্যন্ত কম। সেই মান্ধাতা আমলের ভোঁতা লাঙ্গল আর জীর্ণ-শীর্ণ বলদ দিয়েই তারা কোনোমতে এখনো কৃষিকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। দারিদ্র্যের অভিশাপে জর্জরিত হয়ে জমিতে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও উন্নতমানের রাসায়নিক বা জৈব সার তারা সঠিক মাত্রায় ব্যবহার করতে পারছেন না। তাছাড়া, একই জমিতে কোনো বিশ্রাম না দিয়ে ক্রমাগত একই ফসলের চাষ করার ফলে জমির স্বাভাবিক উর্বরা শক্তি দিন দিন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর উপর, অমানুষিক পরিশ্রমে এই সামান্য যে ফসল তারা উৎপাদন করছেন, দালাল চক্রের কারণে তারও সঠিক মূল্য তারা পাচ্ছেন না। সবশেষে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরার মতো বিভিন্ন ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিবছরই আমাদের কৃষির উপর চরম আঘাত হানে। মূলত এই সকল বহুমুখী ও জটিল কারণগুলোর জন্যই আজ আমাদের দেশের কৃষকের অবস্থা এতটা শোচনীয় ও করুণ হয়ে পড়েছে।

কৃষি খাত এবং কৃষকের উন্নয়নের জন্য করণীয়

বাংলাদেশের কৃষিখাতের এই পুঞ্জীভূত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করে অতি শীঘ্রই role of farmers কে মূল্যায়ন ও কৃষকের সার্বিক উন্নয়নের জন্য আমাদের রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত দরকার। কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে তবেই দেশের অর্থনীতি হাসবে। এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হলোঃ

১. কৃষকদেরকে আধুনিক কৃষিকাজ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করে গড়ে তুলতে হবে।

২. কৃষকদের হাতে সহজ শর্তে কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি, ট্রাক্টর ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি তুলে দিতে হবে।

৩. সমাজে যারা ভূমিহীন ও গরিব কৃষক, খাসজমি বিতরণের মাধ্যমে তাদের নিজস্ব আবাদি ভূমির ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. শুকনো মৌসুমে জমিতে নির্বিঘ্নে সেচ দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাম্প যন্ত্র ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সুলভ মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে।

৫. মহাজনি প্রথা বাতিল করে ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কৃষকদেরকে অত্যন্ত স্বল্প সুদে বা বিনা সুদে দ্রুত কৃষি ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

৬. কৃষি বাজারের সকল প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের ত্রুটি দূর করে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কিনে কৃষকের ন্যায্য মূল্যের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৭. টমেটো, আলুসহ অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত সংখ্যক হিমাগার বা কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

উপসংহার

পরিশেষে এটি বলা যায় যে, কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ। বাংলাদেশের কৃষকের ভাগ্য ও তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে এই দেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের ভাগ্য ওতপ্রোতভাবে নির্ভর করে। কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির মূল মেরুদণ্ডই হলো কৃষি। আর এই মেরুদণ্ডকে সোজা ও মজবুত রাখতে হলে, অর্থাৎ এদেশের সার্বিক উন্নতি নিশ্চিত করতে হলে তাই সর্বপ্রথম আমাদের অবহেলিত কৃষি ব্যবস্থা ও কৃষকের উন্নয়ন করতে হবে। কৃষককে তার ফসলের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। তা না হলে দেশের সার্বিক উন্নতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিকল্পনা চরমভাবে ব্যাহত হবে। কৃষি খাতের এই বিশাল সংস্কার ও উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব কেবল সরকারের একার পক্ষে নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই পবিত্র দায়িত্ব আমাদের সবার, তথা দেশের সকল স্তরের জনগণের। তাই সরকারের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে, বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজকে আমাদের কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই আমাদের economy of Bangladesh একটি টেকসই রূপ লাভ করবে এবং কৃষকের মুখে ফুটবে সত্যিকারের হাসি।

Leave a Comment