দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য লও এ নগর ভাব সম্প্রসারণ

দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য লও এ নগর ভাব সম্প্রসারণ
Rate this post

প্রকৃতি মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আর সেই প্রকৃতির প্রাণ হলো দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর ভাবনার মূল ভিত্তি অরণ্য। মানুষ জন্মের পর থেকেই বন, নদী, পাহাড় ও গাছপালার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। সভ্যতার শুরুতে মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, ওষুধ এবং নিরাপত্তার বড় অংশই এসেছে বন থেকে। আজও মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বিশুদ্ধ বাতাস, অক্সিজেন, বৃষ্টিপাত ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বন অপরিহার্য। কিন্তু আধুনিক নগরায়নের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য গাছ কাটা হচ্ছে এবং বনভূমি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর শুধু একটি সাহিত্যিক আহ্বান নয়, এটি বর্তমান বিশ্বের বাস্তব প্রয়োজন।

অরণ্য শুধু গাছের সমষ্টি নয়। এটি অসংখ্য প্রাণী, পাখি, উদ্ভিদ এবং অণুজীবের নিরাপদ আবাসস্থল। বন মানুষকে ফল, কাঠ, ঔষধি গাছ এবং নানা ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ দেয়। পাশাপাশি বন মাটির উর্বরতা বজায় রাখে, নদী ও জলাধার রক্ষা করে এবং পরিবেশকে সুস্থ রাখে। পৃথিবীর জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে অরণ্যের ভূমিকা অপরিসীম।

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন ছাড়ে। এর ফলে বায়ু পরিষ্কার থাকে এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব কিছুটা কমে। বন বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং সমতলে বন্যার ঝুঁকি কমাতেও বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং উন্নয়নের নামে প্রতিনিয়ত বন কেটে নতুন শহর, শিল্পকারখানা এবং সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। অনেক সময় পরিকল্পনাহীনভাবে বন উজাড় হওয়ায় পরিবেশের বড় ক্ষতি হচ্ছে। গৃহনির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি এবং জ্বালানির চাহিদা পূরণেও বিপুল পরিমাণ গাছ কাটা হচ্ছে। এর ফলে বনভূমি কমছে এবং বন্য প্রাণীদের স্বাভাবিক বাসস্থান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

বন ধ্বংসের প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনেই ফিরে আসে। তাপমাত্রা বাড়ে, বিশুদ্ধ বাতাস কমে যায় এবং পানির সংকট দেখা দেয়। কৃষি উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়। অরণ্য কমে গেলে জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়, যা পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

নগর মানুষের আধুনিক জীবনের অনেক সুবিধা এনে দিলেও মানসিক শান্তি সব সময় দিতে পারে না। ব্যস্ততা, যানজট, দূষণ এবং কৃত্রিম পরিবেশ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে কঠিন করে তোলে। অনেক মানুষ প্রকৃতির কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে মানসিক চাপ, একাকীত্ব এবং উদ্বেগে ভোগে। অরণ্যের সবুজ পরিবেশ মানুষের মনকে সতেজ করে এবং সৃষ্টিশীলতাকে জাগিয়ে তোলে। তাই প্রকৃতির সংস্পর্শ মানুষের সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বন রক্ষা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকেরও কর্তব্য। অপ্রয়োজনীয় গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। সামাজিক বনায়ন কার্যক্রমে অংশ নেওয়া, বনভূমি দখল রোধ করা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ ও বন সংরক্ষণের শিক্ষা দিতে হবে। পাশাপাশি আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করে অবৈধ বন উজাড় বন্ধ করতে হবে।

আজ আমরা যদি বন রক্ষা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি অনিরাপদ পৃথিবীর মুখোমুখি হবে। বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে বন সংরক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। একটি গাছ শুধু আজকের জন্য নয়, আগামী দিনের জীবনও রক্ষা করে। তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত প্রকৃতিকে ভালোবাসা এবং বন সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।

দাও ফিরিয়ে সে অরণ্য, লও এ নগর শুধু একটি সাহিত্যিক অনুভূতি নয়, এটি মানবজাতির টিকে থাকার আহ্বান। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক যত গভীর হবে, ততই পৃথিবী বাসযোগ্য থাকবে। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেই উন্নয়ন হতে হবে পরিবেশবান্ধব। বন রক্ষা মানে মানুষকে রক্ষা করা, ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা এবং পৃথিবীকে সুন্দর রাখা। তাই আজই আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত অরণ্য সংরক্ষণ করব, গাছ লাগাব এবং একটি সবুজ পৃথিবী গড়ে তুলব।

Leave a Comment