এমপিও জটিলতা এখন দেশের হাজারো বিএম ও কারিগরি শিক্ষকের জীবনে বড় দুশ্চিন্তার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সপ্তম গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এনটিআরসিএ’র সুপারিশে নিয়োগ পাওয়ার পরও কয়েক মাস ধরে তারা বেতন-ভাতা ছাড়াই দায়িত্ব পালন করছেন। ঈদুল আজহার মতো বড় ধর্মীয় উৎসব সামনে থাকলেও নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত এসব শিক্ষকের ঘরে নেই আনন্দের পরিবেশ। অনেকেই পরিবার থেকে দূরে থেকে চাকরি করছেন, কিন্তু নিয়মিত আয় না থাকায় মানবেতর জীবন পার করছেন।
দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিএম কলেজ, ভোকেশনাল ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন, পরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাজেও অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন পার হলেও এমপিওভুক্তি সম্পন্ন না হওয়ায় তারা কোনো ধরনের সরকারি বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ফলে ঈদের সময়েও তাদের জীবনে নেমে এসেছে হতাশা ও অনিশ্চয়তা।
বেতন না পেয়ে ধার-দেনায় জীবনযাপন
নতুন নিয়োগ পাওয়া অনেক শিক্ষক এখন ধার-দেনা করে চলছেন। কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার করছেন, আবার কেউ ঋণ নিয়ে মাসের খরচ সামলানোর চেষ্টা করছেন। কয়েক মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় তাদের অনেকের সঞ্চয়ও শেষ হয়ে গেছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, তারা সরকারি নিয়ম মেনে এনটিআরসিএ পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মেধার ভিত্তিতে চাকরি পেয়েছেন। এরপরও যোগদানের পর বেতন পেতে এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে, তা তারা কল্পনাও করেননি। বিশেষ করে যারা দূরের উপজেলায় চাকরি করছেন, তাদের খরচ আরও বেশি বেড়ে গেছে। বাসা ভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় সামলাতে গিয়ে তারা চরম সংকটে পড়েছেন।
অনেক শিক্ষক বলছেন, পরিবারকে এখন আর আশ্বাস দেওয়ার মতো অবস্থাও নেই। ঈদের বাজার করা তো দূরের কথা, স্বাভাবিক জীবনযাপন করাও কঠিন হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকতা পেশার মর্যাদা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আরও পড়ুনঃ নবম পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন কত বাড়তে পারে
দ্রুত এমপিওভুক্তির দাবিতে স্মারকলিপি
এমপিও জটিলতা নিরসনে শিক্ষকরা সম্প্রতি কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব বরাবর আবেদন ও স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। সেখানে তারা দ্রুত ইনডেক্স সম্পন্ন, এমপিওভুক্তি কার্যকর এবং যোগদানের তারিখ থেকে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবি জানিয়েছেন।
শিক্ষকদের দাবি, তারা যেহেতু নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগ পেয়েছেন এবং ইতোমধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন, তাই তাদের বেতন চালু করতে আর বিলম্ব হওয়ার কোনো কারণ নেই। প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তাদের পরিবারকে কষ্ট পোহাতে হচ্ছে।
অনেক শিক্ষক মনে করছেন, ফাইল এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘোরার কারণেই পুরো প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে। এতে নতুন শিক্ষকদের ওপর অযৌক্তিক চাপ তৈরি হয়েছে।
ঈদের আনন্দহীন শিক্ষক পরিবার
ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করার সময়। কিন্তু এবার সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো কারিগরি শিক্ষক। অনেকে বাবা-মায়ের জন্য নতুন কাপড় কিনতে পারেননি। কেউ সন্তানদের ঈদের উপহার দিতে পারছেন না। আবার কেউ গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ভাড়াও জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নতুন চাকরিতে যোগদানের পর পরিবারের সদস্যদের অনেক আশা ছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেতন না পাওয়ায় পরিবারেও তৈরি হয়েছে হতাশা। অনেক শিক্ষক বলছেন, চাকরি পেয়েও তারা আর্থিকভাবে আগের চেয়েও বেশি সংকটে আছেন।
শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমাজে শিক্ষকতা একটি সম্মানজনক পেশা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ছেন। পরিচিত মানুষের কাছে বারবার ধার চাইতে গিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে।
মেহজাবিন আক্তারের কষ্টের গল্প
কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক মেহজাবিন আক্তার জানান, তিনি পরিবারের কাছ থেকে দূরে একটি উপজেলায় যোগদান করেছেন। কয়েক মাস ধরে নিজের খরচ চালাতে গিয়ে তিনি চরম সমস্যার মুখে পড়েছেন।
তার ভাষায়, মেধার প্রমাণ দিয়ে চাকরি পেলেও এখন স্বাভাবিকভাবে জীবন চালানো কঠিন হয়ে গেছে। প্রতি মাসে বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া এবং যাতায়াত বাবদ বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু বেতন না থাকায় সব খরচ ধার করে চালাতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ধার নেওয়ার কারণে এখন অনেকে আর টাকা দিতেও চাইছেন না। এমনকি স্থানীয় দোকানেও বাকি বন্ধ হয়ে গেছে। ঈদের সময় পরিবারের জন্য কিছু পাঠাতে না পারার কষ্ট তাকে আরও বেশি মানসিক চাপে ফেলেছে।
তার দাবি, শিক্ষকরা কোনো অনুদান চান না। তারা শুধু যোগদানের তারিখ থেকে প্রাপ্য বেতন-ভাতা দ্রুত চালুর দাবি জানাচ্ছেন।
প্রশাসনিক জটিলতায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা
কারিগরি শিক্ষকরা বলছেন, এমপিও জটিলতা এখন তাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগদানের পর দ্রুত এমপিও সম্পন্ন হওয়ার আশা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। ফলে শিক্ষকরা এখন ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
প্রভাষক তানভীর আহমেদ বলেন, ঈদুল ফিতরের সময় তারা ভেবেছিলেন খুব দ্রুত বেতন চালু হবে। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার মতে, প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে শিক্ষকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, একজন শিক্ষক যখন মুদি দোকানের বাকির ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেন, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত কষ্ট নয়, পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও লজ্জার বিষয়। তিনি দ্রুত বকেয়া বেতন পরিশোধের দাবি জানান।
শিক্ষকদের অভিযোগ, ফাইল অনুমোদনের ধীরগতি এবং দাপ্তরিক জটিলতার কারণে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। অথচ বাস্তবে তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে নতুন শিক্ষকদের গুরুত্ব
বর্তমানে দেশে কারিগরি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো হচ্ছে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। সেই লক্ষ্য পূরণে নতুন কারিগরি শিক্ষকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু যারা শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলবেন, তারাই যদি আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকেন, তাহলে পুরো ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। শিক্ষকরা বলছেন, খালি পেটে কিংবা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
সহকারী শিক্ষক মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন এবং শিক্ষার্থীদের প্র্যাকটিক্যাল করাচ্ছেন। কিন্তু কয়েক মাসেও কোনো বেতন না পাওয়ায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েছেন। তার মতে, নতুন শিক্ষকদের প্রতি এমন অবহেলা কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে শিক্ষক পরিবারের সদস্যদের কষ্ট পোহাতে হচ্ছে। তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত এমপিওভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আরও পড়ুনঃ ছুটির মধ্যেও খোলা ১৭৫ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চৌদ্দগ্রামে শিক্ষা প্রশাসনে প্রশ্ন
শিক্ষকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা
দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পাওয়ায় নতুন শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। অনেকেই বলছেন, চাকরি পাওয়ার আনন্দ এখন আর নেই। বরং প্রতিদিন নতুন উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষ করে যাদের পরিবার সম্পূর্ণভাবে তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অবস্থা আরও খারাপ। অনেক শিক্ষক পরিবারকে টাকা পাঠাতে পারছেন না। এতে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেও সমস্যা হচ্ছে।
শিক্ষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে মেধাবীরা শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহ হারাতে পারেন। কারণ চাকরি পাওয়ার পরও যদি মাসের পর মাস বেতন না মেলে, তাহলে নতুনদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
দ্রুত সমাধানের দাবি
ভুক্তভোগী শিক্ষকরা বলছেন, তাদের মূল দাবি খুবই সাধারণ। তারা শুধু চান দ্রুত এমপিওভুক্তি সম্পন্ন করে বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হোক। এতে তারা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন এবং শিক্ষার্থীদের আরও ভালোভাবে পাঠদান করতে পারবেন।
তাদের মতে, শিক্ষক সমাজকে আর্থিকভাবে অনিশ্চয়তায় রেখে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
শিক্ষকদের আশা, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর মানবিক দিক বিবেচনা করে দ্রুত সমস্যার সমাধান করবে। কারণ ঈদের আনন্দ সবার ঘরে পৌঁছানো উচিত, আর একজন শিক্ষকও সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা নয়।
এমপিও জটিলতা এখন শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি হাজারো শিক্ষকের পরিবার, সম্মান এবং জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বড় মানবিক সংকট। দ্রুত সমাধান না হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।











1 thought on “এমপিও জটিলতায় ঈদের আনন্দহীন হাজারো কারিগরি শিক্ষক, বেতন না পেয়ে চরম সংকটে পরিবার”